বাড়িতে আদা চাষের ব্যবসা করে 1 লক্ষ টাকা আয় করুন | Ginger farming business, right now

আমরা সবাই জানি আদা আমাদের প্রত্যেক খাবারের তালিকায় নিজের জায়গা করে রেখেছে। আর আপনি যদি বাড়িতে আদা চাষের ব্যবসা শুরু করেন প্রতিমাসে লক্ষাধিক টাকা ইনকাম করতে পারেন। অন্যান্য কাজ করার সাথে সাথে বাড়িতে আদা চাষের ব্যবসা বর্তমানে অনেক চাষী করে থাকছেন। আপনি যদি কোন কোম্পানিতে কাজ করে থাকেন বা অন্য কোথাও কোনো কাজ করেন, কিন্তু পার্টটাইম কাজ হিসেবে বা পার্ট টাইম ইনকাম হিসেবে আপনার বাড়ির সামনের জায়গাতে আদা চাষ করেন, তাহলে বছরের একটা সময়ে আপনি লক্ষাধিক টাকা ইনকাম করতে পারেন। শুনে হয়ত একটু অবাক হতে পারেন আপনি কিন্তু আদা চাষের ব্যবসা করে কিভাবে আপনি লক্ষাধিক টাকা ইনকাম করবেন তার যাবতীয় তথ্য দেওয়া হল দেখুন।

Ginger cultivation in sacks
বস্তায় আদা চাষ

আদা চাষ করতে কি কি জিনিস লাগে?

আদা চাষের ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে সর্বপ্রথম বাড়িতে আদা চাষ করার জন্য বেশ কিছু জিনিস সংগ্রহ করতে হবে বা কিনতে হবে। কারণ আপনি আদা চাষ টা মাঠে গিয়ে করছেন না, আপনি করছেন বাড়িতে, তাই কয়েকটা জিনিস অবশ্যই আপনাকে কিনতে হবে।

  • প্লাস্টিক বস্তা বা প্লাস্টিক ব্যাগ 8 ইঞ্চির (সিমেন্টের বস্তা হলেও হবে)
  • আলোছায়া যুক্ত জায়গা
  • মাটি
  • জৈব সার
  • রাসায়নিক সার
  • সাদা বালি
  • আদা বীজ

বর্তমান সময়ে দেখা গেছে আদা চাষ সবচেয়ে ভালো হয় বস্তাতে। কারণ আমাদের এখানের জলবায়ু অনুযায়ী আদা চাষের ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে সরাসরি মাঠে না চাষ করে বস্তায় চাষ করলে বেশি লাভবান হতে পারেন। বর্তমানে এমন কিছু চাষী রয়েছেন যারা তাদের মাঠ থাকা সত্বেও সেই মাঠে সরাসরি আদার বীজ না বসিয়ে বস্তা তে আদার বীজ বসান। তাই আপনিও আদা চাষের সুবিধার্তে আদা গুলি বসানোর জন্য সিমেন্টের বস্তা অথবা 8 ইঞ্চি প্লাস্টিক প্যাকেট ব্যবহার করুন। যেহেতু আপনি বাড়ির সামনের উঠানে কিংবা আপনার বাড়ি সংলগ্ন জায়গাতে আপনি আদা চাষের ব্যবসা শুরু করতে চলেছেন, তাই আপনাকে প্রতিটি বস্তার অর্ধেক ভর্তি করার মতো মাটিও সংগ্রহ করতে হবে। আর মাটিকে উর্বর করার জন্য জৈব সার এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার আপনাকে করতে হবে।

অবশ্যই পড়ুন- ব্যবসা মাত্র 10 হাজার টাকা দিয়ে

কিভাবে আদা চাষ করবেন?

আদা চাষের ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে আদা চাষ করার সকল পদ্ধতি জানতে হবে। যদিও আদা চাষ করা ভীষণ সহজ কাজ। তবুও যে পদ্ধতিতে আপনি চাষ করলে প্রচুর পরিমাণে আদার ফলন আপনি পাবেন তা হল-

আদা চাষের মাটি প্রস্তুতি

বস্তায় মাটি ভর্তি করার আগে মাটিকে আপনাকে উর্বর বানাতে হবে। আর মাটি উর্বর বানানোর জন্য 3:1:1 ফর্মুলা মেনে চলতে হবে।

  • অর্থাৎ তিন ভাগ মাটি, একভাগ জৈব সার, এক ভাগ সাদা বালি। এই ফর্মুলা অনুযায়ী আপনাকে মাটিকে সুন্দর করে মিক্সিং করতে হবে।
  • মাটি ভালোভাবে মিক্সিং হয়ে গেলে সেটা বস্তার ভেতরে ঢালতে হবে।
  • তারপর বাজার থেকে কিনে আনা আদার বীজ গুলিকে ফাংগিসাইড পাউডারের জল করে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • তারপর প্রতিটা বস্তায় তিনটে করে আধার ব্রীজ দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে রেখে দিতে হবে।
  • এরপর প্রতিটা বস্তায় পরিমাণমতো জল দিয়ে ঠান্ডা এলাকায় বা ছায়াযুক্ত অঞ্চলে রেখে দিতে হবে।
  • সাত দিনের মধ্যে প্রতিটা আদার ব্রিজের আধার গাছ জন্মে যাবে। এরপর নিয়মিত একদিন ছাড়া প্রতিটা বস্তায় পরিমাণ মতো জল দিতে হবে।
  • দুমাস পর মাটি টাকে একটু খুসে দিতে হবে বা আলগা করে দিতে হবে, যাতে ভেতরে আরো বড় হতে পারে এবং বেশী বাড়তে পারে।
  • পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আপনি আদা বস্তা থেকে বার করতে পারবেন এবং মার্কেটে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন।

আদা চাষের প্রশিক্ষণ

আদা চাষের ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আপনি যদি বিনা প্রশিক্ষণে আদা চাষ করতে চান তাহলে আপনি সফল হতে নাও পারেন কারণ আদা গাছ রক্ষণাবেক্ষণ করা শেখার বিষয় আছে। তাই আপনি ব্যবসায় নামার আগে আদা চাষ শিখুন অল্প বস্তায় চাষ করে। এক বছর আপনি যদি অল্প বস্তায় চাষ করেন তাহলে অনেকটাই আপনি শিখে যাবেন পরের বছরে বেশি বস্তা চাষ করুন এবং বেশি পরিমাণে লাভবান হবেন। আমরা সব সময় প্রশিক্ষণ নিয়েও ভালোভাবে চাষ করতে পারিনা তার জন্য আমাদের মাঠে চাষ করে দেখতে হয়। কাজ করার সাথে সাথে অভিজ্ঞতা বাড়ে এবং পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতার জন্যেই ভালো ফসল জন্মায়। তাই আপনি নিজে আদা চাষের ব্যবসায় নামার আগে আদা চাষ অল্প পরিমাণে করতে করতে শিখুন।

Ginger seed planting method
আদা বীজ রোপন পদ্ধতি

আদা বীজ রোপন পদ্ধতি

প্রতিটা আদার চাষী আদা চাষ করার সময় বা আদা বীজ রোপন করার সময় 50 সেন্টিমিটার থেকে 25 সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে রোপণ করেন। প্রতিটা 50 সেন্টিমিটার দূরত্ব 5 সেন্টিমিটার গভীর করে আদার বীজ বসানো হয়। আদা বীজ রোপণের সময় দেখতে হবে যে প্রতিটা আদার বীজের যেন অঙ্কুরিত মুখ বার হয়, বা অঙ্কুরিত হবার পরই আদা রোপণ করতে হয়। রোপণের 75 থেকে 90 দিনের পর থেকেই প্রতিটা সারির আদার মাটি সরিয়ে আদার রাইজোম সংগ্রহ করা যায়। এছাড়াও আপনি উপরের নিয়ম অনুযায়ী আদা রোপন করতে পারেন বস্তার ভেতরে। আপনি কি পদ্ধতিতে আদা চাষ করবেন সেটা আপনার পছন্দমত। তবে বস্তায় আদা চাষের ব্যবসা শুরু করলে আপনি বেশি সফলতা পাবেন।

আরো পডুন- টিস্যু পেপার তৈরির ব্যবসা

বস্তায় আদা চাষের ব্যবসায় সার প্রয়োগ

বেশি ফলন পাবার জন্য প্রতিটা চাষী তার ফসলে জৈব সারের সাথে সাথে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকেন। তাই আপনিও যখন আধার চাষ করবেন তখন আপনাকে অবশ্যই জৈব সারের সাথে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। যে পদ্ধতিতে আপনি জৈব সার ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করবেন তা হল-

  • বস্তায় আদা চাষ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে যেমন মাটি প্রস্তুত এর সময় জৈব সারের সাথে মাটি মিশ্রন করে মাটি প্রস্তুত করতে হয়। ঠিক তেমন প্রতি 15 দিন অন্তর অল্প অল্প জৈব সার গাছের গোড়ায় দিতে পারেন।
  • আদা চাষের 50 দিন পর আপনাকে ইউরিয়া ডিএপি অল্প পরিমাণে সমানভাবে প্রতিটা প্যাকেটে দিতে হবে। আর অল্প পরিমাণ ইউরিয়া আরো 30 দিন পর অর্থাৎ আদা রোপনের 80 থেকে 100 দিনের মধ্যে প্রতিটা প্যাকেটে অল্প অল্প পরিমাণ নিতে হবে।
  • অনেক কৃষি বৈজ্ঞানিক বলেন যে আদা চাষের ফলন বেশি পেতে হলে পটাশ সার ব্যবহার করতে হবে। তাই আপনিও পরীক্ষামূলক ভাবে কিছু প্যাকেটে পটাশ সার ব্যবহার করে দেখতে পারেন। কেমন ফলন হয় যদি বেশি ফলন হয় দেখেন তাহলে পরের বছর থেকে পটাশ সারের ব্যবহার আপনি বানাতে পারেন।
  • জৈব সার হিসেবে গোবর, ছাই, পাতা পচা বা লিভ মোল্ড, ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করতে পারেন।

আদা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কিভাবে করা হয়?

আদা চাষের ব্যবসা করতে গেলে অবশ্যই আপনাকে আদার সংরক্ষণ পদ্ধতি জানতে হবে। আদা সংরক্ষন যদি আপনি করতে পারেন তাহলে বছরের যে সময়ে আদার দাম বেশি পরিমাণে থাকে বাজারে সেই সময় আপনি বিক্রি করতে পারেন। আদা রোপণের 9 থেকে 10 মাস পরে যখন আধার গাছ আস্তে আস্তে হলুদ হয়ে শুকনো হয়ে যাবে অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্য আগর গাছ শুকনো হয়ে যায়। ওই সময় আপনাকে কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে কিংবা প্রতিটা সিমেন্টের বস্তা থেকে আধা গুলো বার করার জন্য বস্তা কেটে কিংবা বস্তা কে উল্টে আধা বের করতে হবে। এই পদ্ধতিতে আপনি আদা সংগ্রহ করতে পারেন। আদার গায়ে যেহেতু মাটি লেগে থাকে তাই আদা গুলোকে জলে ভালো করে ধুয়ে মাটি পরিষ্কার করে আদা সংগ্রহ করতে হবে।


আদা সংরক্ষণ করার জন্য আপনাকে ছায়াযুক্ত কোন স্থান বেছে নিতে হবে এবং সেই ছায়াযুক্ত স্থানে 2 ইঞ্চি পুরু বালির স্তর তৈরি করে তার ওপর আদা রেখে আবার বালি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বালি দিয়ে আদা ঢেকে দেওয়া এবং নিচে বালি থাকার কারণে আদা দীর্ঘদিন পর্যন্ত পচন এবং জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে। এই পদ্ধতি মেনে যদি আপনি আদা চাষের ব্যবসা করেন তাহলে আদার গুনাগুন এবং ওজন আপনি ভাল পাবেন।

আদা চাষের উপযুক্ত সময় কোনটি?

সাধারণত জুন জুলাই মাস আদা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। যেসকল চাষিরা আদা চাষ করে থাকেন তারা সবাই বছরের জুন জুলাই মাসে আদা বীজ গুলি বসান। আর ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে আপনি পরিপূর্ণ আদা তুলতে পারবেন বস্তা থেকে। সাধারণত একটি আধার কার্ড পরিপূর্ণ হতে সময় লাগে 4-5 মাস এবং পরিপূর্ণ আদা তোলা হয় ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে।

আদা চাষের ব্যবসা করতে কত টাকা লাগে?

আদা চাষের ব্যবসা করতে আপনার খুবই অল্প পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে। ধরে নেওয়া যেতে পারে আপনার প্রথম 100 বস্তায় আদা চাষ করবেন। তাহলে 100 বস্তায় আদা চাষের জন্য আপনাকে 8 থেকে 10 কেজি আদার বীজ কিনতে হবে। 8 থেকে 10 কেজি আদার বীজ কিনতে আপনার খরচ হবে 1.5 থেকে 2 হাজার টাকা।
একশ বস্তা মাটি কেনার জন্য আপনার খরচ হবে আরও 2 হাজার টাকা।
আদা রোপন করার জন্য যে শ্রমিক নিয়োগ করবেন তার পেছনে খরচ হবে 1000 টাকা। তাহলে আপনাকে 100 বস্তায় আদা চাষ করার জন্য 5000 টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ঠিক এই অনুপাতে আপনি যত বস্তা তে আদা চাষ করবেন তার একটা হিসেব আপনি মোটামুটি তৈরি করে নিতে পারেন।

অবশ্যই পড়ুন- মৌমাছি চাষের ব্যবসা

আদা চাষের ব্যবসায় লাভ কত?

আদা চাষ করতে যেমন অল্প পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় তেমন আগা চাষের ব্যবসায় লাভের পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। সিমেন্টের বস্তা তে আদা চাষ করলে প্রতিটা বস্তা থেকে আপনি কম করে 1.5 কেজি থেকে 2 কেজি আদা পাবেন। ১০০ টা বস্তায় আপনি যদি শুরুতে আগা চাষ করেন তাহলে প্রতি একশো বস্তায় আপনি 150 কেজি থেকে 200 কেজি আদা পাবেন। পাইকারিভাবে আপনি যদি 70 টাকা দামের প্রতি কেজি আদা বিক্রি করেন তাহলেও আপনার লাভ থাকবে 14000 টাকা।

5000 টাকা বিনিয়োগ করে 14 হাজার টাকায় আপনি আধা বিক্রি করতে পারছেন। এইভাবে আপনার যদি বেশি জায়গা থাকে আর আপনি যদি বেশি জায়গাতে বেশি পরিমাণ আদা চাষ করেন তাহলে আপনার প্রতি বছরে একটা ভালো পরিমাণ টাকা ইনকাম করতে পারছেন। বর্তমানে গ্রামীণ আদা চাষের ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র আদা চাষ করে প্রতি বছরে 1 লাখ টাকার বেশি ইনকাম করেন।

জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও FAQ

আদা চাষের ব্যবসা করতে নূন্যতম কত টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।

উত্তর: 4 থেকে 5 হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয় আদা চাষের ব্যবসায়।

100 বস্তা আদা চাষ করতে জৈব সার কত লাগে?

উত্তর: 100 বস্তায় আদা চাষ করতে গেলে জৈব সার লাগবে 20 থেকে 30 কেজি।

100 বস্তায় আদা চাষ করতে রাসায়নিক সার কত লাগবে?

উত্তর: 5 থেকে 6 কেজি রাসায়নিক সার লাগবে।

বস্তায় আদা চাষ করতে কি কি রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়?

উত্তর: পটাশ, ইউরিয়া, DAP, ফসফেট রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়।

আদা চাষের ব্যবসায় লাভ কত?

উত্তর: 100 টা বস্তায় আপনি আদা চাষ করলে লাভ করতে পারবেন 10 হাজার টাকা থেকে 12 হাজার টাকা

নতুন ব্যবসার আইডিয়া দেখুন-

ফুল ঝাড়ু তৈরির ব্যবসা

ফুচকা তৈরির ব্যবসা করে 1 লক্ষ টাকা লাভ

Leave a Comment